Header Ads

ধারাবাহিকতা রক্ষায় জোর সৌদি বাদশাহর

সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকে বাদশাহ বাংলাদেশের চলমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন বলে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক জানিয়েছেন।
গতকাল বুধবার স্থানীয় সময় দুপুরে রিয়াদের রাজকীয় প্রাসাদে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে বাদশাহ ও শেখ হাসিনা একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।
পররাষ্ট্রসচিব বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাদশাহ বলেছেন উন্নয়নের ধারাবাহিকতা দরকার। এতে তো বোঝা যায়, তিনি প্রধানমন্ত্রীর ধারাবাহিকতার কথা বলেছেন। এটা হলে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে।’
সৌদি আরবে চলতি বছর এটি প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় সফর। গত এপ্রিলে সৌদি আরব, বাংলাদেশসহ ২২ দেশের সামরিক মহড়া ‘গাল্ফ শিল্ড-১’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি।   
শহীদুল হক বলেন, ‘সৌদি বাদশাহর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এবারের বৈঠকও অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ ও উষ্ণ পরিবেশে হয়েছে। সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদ মানবিক গুণাবলি নিয়ে বলেছেন যে, সব মুসলমানের প্রতি তার কর্তব্য রয়েছে। ফিলিস্তিনের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনেরও প্রশংসা করেছেন তিনি।’
পররাষ্ট্রসচিব জানান, বাদশাহ তাঁর প্রাসাদের গাড়ি-বারান্দায় এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানিয়ে ভেতরে নিয়ে যান। বাদশাহ প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, ‘এটা আপনার বাড়ি, আপনি সব সময় এখানে আমন্ত্রিত।’
শহীদুল হক বলেন, মধ্যাহ্নভোজের সময় বাদশাহ নিজে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে খাবার ঘরে যান। তিনি সৌদি আরবের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবার দেখিয়ে সেগুলোর নাম প্রধানমন্ত্রীকে বলেন। বৈঠকে বাদশাহ সালমান অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে দুই দেশের সহযোগিতার সুযোগগুলো আরো কাজে লাগানোর ওপর জোর দেন।
পরে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের নতুন ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নিজেও সৌদি বাদশাহর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের চমৎকার সম্পর্ক। খুব ভালো আলোচনা হয়েছে। সৌদি বাদশাহকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছি। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে আসবেন।’
বাংলাদেশে আরো সৌদি বিনিয়োগ চান প্রধানমন্ত্রী : এর আগে সকালে রিয়াদে কিং সৌদ প্যালেসে সৌদি আরবের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। বৈঠকে তিনি সৌদি ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে আরো বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘কৌশলগত অবস্থান, আঞ্চলিক সংযোগ, বিদেশি বিনিয়োগ ও গ্লোবাল আউটসোর্সিংয়ের জন্য বাংলাদেশ একটি উদীয়মান কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গভাবে চলমান আটটি শতভাগ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র রয়েছে।’
অনুষ্ঠানে কাউন্সিল অব সৌদি চেম্বারের (সিএসসি) নেতারা, রিয়াদ চেম্বার অব কমার্সের নেতারা ও বাংলাদেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই বাংলাদেশে ব্যবসার সুযোগ সম্পর্কে বিশদভাবে তুলে ধরেন। বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘অসাধারণ’ হিসেবে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা সাধারণ বিশ্বাস, সংস্কৃতি, মান ও আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে।
২০১৭-১৮ অর্থবছরে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে তথ্য দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগগুলো পুরোপুরি কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছি।’
বাংলাদেশে ২৫টি প্রকল্পে পাঁচ বিলিয়ন ডলার সৌদি বিনিয়োগের কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মূলত কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, বস্ত্র ও পোশাক, চামড়া, পেট্রো-রাসায়নিক, প্রকৌশল ও সেবা খাতে সৌদি বিনিয়োগ আসছে।
২০১৮ সালের মার্চে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০২১ সালের মধ্যে আমরা উন্নয়নশীল দেশ হব এবং ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা উন্নত দেশ হব।’ আগামী বছরে প্রবৃদ্ধি ৮.২৫ শতাংশ হবে বলে আশার কথা শোনান প্রধানমন্ত্রী।
তথ্য-প্রযুক্তি খাতে উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরকে দ্রুততর করছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তর তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। গত অর্থবছরে ৩০ দশমিক ৬৫১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন সবজি উৎপাদনে তৃতীয় বৃহত্তম, ধান উৎপাদনে চতুর্থ বৃহত্তম এবং মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদনকারী দেশ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তবতা। ইন্টারনেটভিত্তিক পাবলিক সার্ভিস ডেলিভারি ব্যাপক অবদানের জন্য তৃণমূল পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় দ্রুত ও সহজে সেবা দেওয়ার জন্য আমরা তথ্য-প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরি করেছি।’ দেশে ১৫ কোটিরও বেশি সিম ব্যবহার এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯ কোটি ছাড়িয়ে গেছে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উেক্ষপণের কথাও বলেন তিনি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ২০ হাজার মেগাওয়াটে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শুরু করার পর আমরা পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে এক ধাপ এগিয়ে চলেছি।’
সিএসসির চেয়ারম্যান সামি এ আলাবাদি, সিএসসির মহাসচিব সৌদ এ আলমাসারি এবং বাংলাদেশে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ এইচ এম আল-মুতাইরি এ সময় উপস্থিত ছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, বিডার চেয়ারম্যান কাজী মো. আমিনুল হক, পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক এবং সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহও উপস্থিত ছিলেন।
রিয়াদে বাংলাদেশের নতুন দূতাবাস ভবনের উদ্বোধন : সৌদি আরবের রিয়াদে নিজস্ব জমিতে বাংলাদেশের দূতাবাস ভবনের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বিকেলে রিয়াদের কূটনৈতিক কোয়ার্টারে সাত হাজার ৯৫০ বর্গমিটার আয়তনের ওই প্লটে নির্মিত দূতাবাস ভবনটি তিনি উদ্বোধন করেন।
এত দিন রিয়াদে ভাড়াবাড়িতে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাজ চলত। প্রধানমন্ত্রী ২০১৬ সালের জুনে সৌদি আরব সফরে গিয়ে নতুন দূতাবাস ভবনের ভিত্তি স্থাপন করেন। ওই বছর ২৫ আগস্ট চ্যান্সেরি কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ শুরু হয়। তিন হাজার ৮১৮ দশমিক ৬৮ বর্গমিটার আয়তনের ওই দূতাবাস ভবনের সেবাপ্রত্যাশীদের অপেক্ষার জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুপরিসর অপেক্ষা কেন্দ্রে ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সৌদি বাদশাহর আমন্ত্রণে চার দিনের সফরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সৌদি আরব পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর এই সফরে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা এবং তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী মক্কায় ওমরাহ পালন করবেন। সফর শেষে আগামীকাল শুক্রবার তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

No comments

Powered by Blogger.