Header Ads

আ. লীগে এমপিবিরোধী জোট, প্রস্তুত বিএনপি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বরগুনা জেলার রাজনীতি এখন অনেকটাই চাঙ্গা। জেলার দুটি আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য ছাড়াও দলের সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা এরই মধ্যে গণসংযোগ শুরু করেছেন। দুটি আসনেই আওয়ামী লীগের ভেতরে রয়েছে এমপিবিরোধী শক্ত জোট। সম্প্রতি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ দলের একটি বড় অংশ। এর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন জেলা যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সব সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতারা। এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে এ আসন থেকে নির্বাচন করতে পারেন—এমন ধারণার কথা জানিয়েছেন দলের স্থানীয় জ্যেষ্ঠ নেতাকর্মীদের কেউ কেউ।
অন্যদিকে বিএনপিতে দেখা যাচ্ছে এর উল্টো চিত্র। আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা নির্বাচনী গণসংযোগে ব্যস্ত থাকলেও বিএনপি তাদের দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তারা নির্বাচনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। কেন্দ্রের নির্দেশনা পেলেই তারা নির্বাচনে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
বরগুনা-১ আসন : বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী উপজেলা নিয়ে বরগুনা-১ আসন। এ আসনে এরই মধ্যে ভোটের রাজনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বর্তমান সংসদ সদস্যবিরোধী জোট নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ায় সরগরম হয়ে উঠেছে ভোটের মাঠ। বর্তমান সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এখানে পাঁচবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে চারবার নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদে রয়েছেন দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে। এই দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকায় শম্ভু ও তাঁর ছেলে সুনাম দেবনাথের বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়নসহ বহু অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও মাদক বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছে সুনির্দিষ্ট ২৪ দফা লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা। এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের পক্ষ সমর্থন করছেন যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সব সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতারাও। এরই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ গত ৪ সেপ্টেম্বর বরগুনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সংসদ সদস্য শম্ভুকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন জেলা আওয়ামী লীগ ও এর সব সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতারা। এরপর কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ২৭ সেপ্টেম্বর উভয় পক্ষকে ঢাকায় দলীয় কার্যালয়ে ডেকে দীর্ঘ বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় ওবায়দুল কাদের বলেন, বরগুনা-১ আসনের সব বিষয়ে এরই মধ্যে দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবগত আছেন। তিনিই এ বিষয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত দেবেন।
বরগুনা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাকর্মীরা জানায়, আগামী ২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরগুনার তালতলী আসবেন বলে তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা বরগুনা-১ আসন থেকে নির্বাচন করেছিলেন।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শম্ভুবিরোধী জোটবদ্ধ হয়ে বরগুনা-১ আসনে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন অন্তত এক ডজন মনোনয়নপ্রত্যাশী ও প্রভাবশালী নেতারা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক জেলা পরিষদ প্রশাসক ও বরগুনা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর কবীর, সাবেক সংসদ সদস্য ও বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা এনজিও উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি আব্দুল মোতালেব মৃধা, দলের জেলা শাখার নেতা, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বরগুনা শাখার সভাপতি ও বরগুনা পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. শাহজাহান, জেলা যুবলীগের সভাপতি ও দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান মহারাজ, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি গোলাম সরোয়ার টুকু, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও কেন্দ্রীয় কৃষিবিষয়ক উপকমিটির অন্যতম সদস্য, ব্যবসায়ী এস এম মশিউর রহমান সিহাব, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য গোলাম সরোয়ার ফোরকান, আমতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান জি এম দেলোয়ার হোসেন, সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম নিজাম উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী ও আমতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জাকিয়া এলিচ, তালতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক জোমাদ্দার, বরগুনা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি শাহ মো. ওয়ালী উল্লাহ অলি, জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. সাহাব উদ্দিন সাবু প্রমুখ। এই নেতাদের দাবি, সংসদ সদস্য শম্ভু ছাড়া যাঁকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে তাঁকে নিয়েই একযোগে নির্বাচনে নামবেন বলে তাঁরা অঙ্গীকারবদ্ধ।
অন্যদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বর্তমান সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ করেছেন ওই নেতাদের বিরুদ্ধে। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে শম্ভুও তাঁর সমর্থকদের নিয়ে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মো. মতিয়ার রহমান তালুকদার, বর্তমান সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম মোল্লা, জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আব্দুল খালেক, দলের জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি মো. মাহবুবুল আলম ফারুক মোল্লা, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির শ্রমবিষয়ক সহসম্পাদক ও বিমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি ফিরোজ উজ-জামান মামুন এবং সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমান প্রমুখ।
বরগুনা-২ আসন : বামনা, পাথরঘাটা ও বেতাগী উপজেলা নিয়ে বরগুনা-২ আসন। এ আসনে এরই মধ্যে ভোটের রাজনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। এ আসনেও আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্যবিরোধী জোট নির্বাচনকে সামনে রেখে তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ায় সরগরম হয়ে উঠেছে ভোটের মাঠ।
২০১৩ সালের ২৬ জুলাই মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় এই আসনের সংসদ সদস্য মধুমতি টাইলস লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী গোলাম সবুর টুলুর মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে টুলু পরিবারের কেউ অংশ নেবেন, এমনটাই প্রত্যাশা ছিল তৃণমূল নেতাকর্মীদের। সে সময় শোকসন্তপ্ত পরিবারের কেউ নির্বাচনে না আসায় উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন পাথরঘাটা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত হাচানুর রহমান রিমন। এরপর ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত হন তিনি।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেই ১৯৯৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত একাধিকবার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং সর্বশেষ দু’দুবার এমপি নির্বাচিত হয়ে এখন পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠে ‘নট আউট’ রয়েছেন শওকত হাচানুর রহমান রিমন। এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বর্তমান সংসদ সদস্য শওকত হাচানুর রহমান রিমনের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি অংশ। অন্যদিকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে শওকত হাচানুর রহমান রিমন তাঁর কর্মী সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে আরো রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম গোলাম সরোয়ার টুলুর কন্যা ও জেলা আওয়ামী লীগ সহসভাপতি ফারজানা সবুর রুমকী, কেন্দ্রীয় যুবলীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক সুভাষ চন্দ্র হাওলাদার, বরগুনা পৌরসভা থেকে দু’দুবার নির্বাচিত (বর্তমান) মেয়র ও ব্যবসায়ী মো. শাহাদাত হোসেন, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও বামনা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হারুন অর রশীদ, বেতাগী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান মেয়র এ বি এম গোলাম কবীর, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ফারুক মেজবাহ উদ্দীন খান, বামনা উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইতুল ইসলাম লিটু মৃধা, পাথরঘাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাবির হোসেন, একই উপজেলা শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও পাথরঘাটা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম রিপন, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক মো. মাহবুবুর রহমান টুকু এবং সাবেক ছাত্রনেতা ও কৃষিবিদ শামসুল আলম প্রমুখ।
অন্যদিকে এ আসনে বিএনপি থেকে কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন নির্বাচনী প্রচার ও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আরো রয়েছেন একাধিকবার নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য ও বরগুনা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ‘ক্যারিশম্যাটিক’ নেতা নুরুল ইসলাম মণি। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় না থাকলেও এ নির্বাচনী এলাকায় তাঁর একটি শক্ত অবস্থান রয়েছে বলে মনে করে বিএনপি দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ।

No comments

Powered by Blogger.