Header Ads

ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে তারেক

তারেক রহমান কিভাবে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেন না ব্রিটিশ কর্মকর্তারা। সাংবাদিক, সরকারের প্রতিনিধি সবার কাছেই তাঁরা বরাবরই ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা আইনের দোহাই দিয়ে এসেছেন। অবশেষে বিএনপিই প্রথমবারের মতো স্বীকার করল, তাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন। বাংলাদেশি পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া এবং নাগরিকত্ব সমর্পণ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এক দিন আগেই তারেক রহমানের পাসপোর্ট জমা দেওয়ার তথ্য চ্যালেঞ্জ করে প্রমাণ দাবি করেছিল বিএনপি। তবে দলটি স্বীকার করেছে যে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়ার জন্যই তারেক রহমান তাঁর বাংলাদেশি পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন।
তবে সেই পাসপোর্ট জমা দেওয়াকে নাগরিকত্ব প্রত্যাহার বলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম যে বক্তব্য দিয়েছেন, বিএনপি তাকে ‘বেআইনি’ অভিহিত করেছে। এ ছাড়া তারেকের পাসপোর্ট-সংক্রান্ত ব্রিটিশ হোম অফিসের (স্বরাষ্ট্র দপ্তরের) চিঠিতে ১৩টি বড় ধরনের ভুল থাকার কথা দাবি করে একে ‘রহস্যময়’ বলে উল্লেখ করেছে বিএনপি।
অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, চিঠিতে ভুল থাকার বিষয়ে বিএনপি ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তরে অভিযোগ দিতে পারে। বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মূল দেশের নাগরিকত্ব ছাড়তে হয় বলে দাবি করলেও তিনি স্বীকার করেছেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা, পাসপোর্ট না থাকা আর নাগরিকত্ব না থাকা—এগুলোকে এক বিষয় বলে তিনি দাবি করবেন না। তাঁর মতে, এখানে আইনি ব্যাখ্যার সুযোগ আছে।’
তারেক রহমানের পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব থাকা না থাকা নিয়ে বড় দুটি রাজনৈতিক দলের পাল্টাপাল্টি চ্যালেঞ্জের মধ্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ‘আমরা সবাই জানি যে তারেক রহমান সাহেব বিদেশে চিকিৎসার জন্য গেছেন। তারপর এখানে দেশে বর্তমান সরকার তাঁর বিরুদ্ধে যেভাবে মামলা-মোকদ্দমা এবং বিনা বিচারে সাজা দিচ্ছে সে কারণে তিনি অ্যাসাইলাম (রাজনৈতিক আশ্রয়) চেয়েছেন এবং তাঁকে সেটা দেওয়া হয়েছে। অ্যাসাইলামের সময় নিয়ম অনুযায়ী পাসপোর্ট জমা দিতে হয়।’
তারেক রহমানের পাসপোর্ট বিতর্ক সামনে আসার প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন এবং এক বছরের মধ্যেই সেটি গৃহীত হয়েছে।
ফখরুলের দাবি, সরকার ও সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে এটা স্পষ্টতই প্রমাণিত হয় যে বাংলাদেশে তারেক রহমানের জীবন নিরাপদ নয়। এ অবস্থায় তারেক রহমান বিশ্বের অসংখ্য বরণ্য রাজনীতিবিদ, সরকারবিরোধী বিশিষ্ট ব্যক্তির মতোই সাময়িকভাবে বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন এবং সংগত কারণেই তা পেয়েছেন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, যুক্তরাজ্যের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পাসপোর্ট জমা রেখে তারেককে ‘ট্রাভেল পারমিট’ দেওয়া হয়েছে। যখনই তিনি দেশে ফেরার মতো সুস্থ হবেন তখনই তিনি দেশের অন্যান্য নাগরিকের মতোই পাসপোর্টের জন্য আবেদন জানাবেন এবং তা অর্জন করতে পারবেন। সেটি তিনি ফেরত পাবেন।
তারেক রহমানের পাসপোর্ট সমর্পণ করা নিয়ে সম্প্রতি বিতর্ক শুরু হয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমের বক্তব্য ঘিরে। লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শাহরিয়ার আলম বলেছিলেন, ‘লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে সবুজ পাসপোর্ট জমা দিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন তারেক রহমান।’ এরপর সকালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী ওই বক্তব্যকে নির্জলা মিথ্যা দাবি করে বলেন, ‘তারেক রহমান যদি বাংলাদেশি পাসপোর্ট লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে জমা দিয়ে থাকেন তাহলে সেটি প্রদর্শন করুন।’ রিজভী পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও হুমকি দেন। সেদিনই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং তাঁকে উদ্ধৃত করে খবর প্রকাশের দায়ে কালের কণ্ঠ ও বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদককে আইনি নোটিশ পাঠানোর কথা সাংবাদিকদের জানায় বিএনপি। তবে এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সংবাদ সম্মেলন করে তারেক রহমানের পাসপোর্টের প্রতিলিপি এবং তারেক, তাঁর স্ত্রী জোবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা জারনাজ রহমানের পাসপোর্ট ব্রিটিশ হোম অফিসের (স্বরাষ্ট্র দপ্তর) মাধ্যমে বাংলাদেশ হাইকমিশনে ফেরত দেওয়াসংক্রান্ত চিঠির প্রতিলিপি সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেন।
এবার চিঠি নিয়ে প্রশ্ন বিএনপির : তারেকের পাসপোর্ট জমা দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সরবরাহ করা ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের চিঠির সত্যতা নিয়ে গতকাল প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। মির্জা ফখরুল সংবাদ সম্মেলনে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের চিঠিতে ১৩টি বড় ধরনের ভুল পাওয়ার তথ্য তুলে ধরে বলেন, এমনটি ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে করা খুব অস্বাভাবিক। তিনি বলেন, চিঠিতে প্রথমে লিখেছে দপ্তরের নাম। লিখেছে, ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট’। ফখরুলের দাবি, এটির আসল নাম ইমিগ্রেশন কমপ্লায়েন্স অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট। ঠিকানায় কমা, ফুল স্টপ নেই। বাংলাদেশ হাইকমিশনকে লেখা হয়েছে দূতাবাস।
হাইকমিশনের ঠিকানা হিসেবে কুইন্সগেটের বানানও ভুল আছে বলে দাবি করেন ফখরুল। ফোন ও ফ্যাক্স নম্বরগুলোও অপ্রয়োজনীয়ভাবে বোল্ড করে লেখা হয়েছে। এ ছাড়া এমন টাইপ ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর ব্যবহার করে না। তিনি বলেন, “ডিয়ার সারস (উঊঅজ ঝওজঝ), এটা অবশ্যই হবে উঊঅজ ঝওজ। চিঠির ওপরে চারটি পাসপোর্টের কথা লেখা আছে। বলা হয়েছে, ‘রিটেনশন’।”
চিঠির শেষ দিকে ভুলের কথা তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “এরপরে থ্যাংক ইউর পরে কোনো ফুল স্টপ নেই। ‘ণড়ঁত্ং ঋধরঃযভঁষষু’-এর ‘ঋ’টাও বড় হাতের। সেটা কখনো ব্রিটিশরা লিখবে না এবং যিনি সই করেছেন তাঁর কোনো নাম নেই।”
ফখরুল বলেন, ‘আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের (তারেক রহমানের) আইনজীবী এটা সম্পর্কে ডিটেইলস জানতে চেয়েছেন। জানলে আমরা পরে আপনাদের জানাব।’ তিনি আরো বলেন, ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর থেকে তারেক রহমানের পাসপোর্ট যদি লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠানো হয়ে থাকে এবং পাঠানো হয়েছে বলে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে তাতে কোনো আইন বা যুক্তিতে প্রমাণিত হয় না যে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে যে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে, জনগণ তার জবাব জানার জন্য অপেক্ষা করছে।
তারেক রহমানের আইনজীবী ও দলের আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে যে অ্যাসাইলাম সিক (রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা) করেছেন, সেই অ্যাসাইলামে ব্রিটিশ আইনের ১৭ ধারা মোতাবেক উল্লেখ আছে যে পাসপোর্ট অথবা গুরুত্বপূর্ণ  ডকুমেন্ট কারো কাছে যাবে না। শুধু যিনি হোল্ডার (মালিক) তাঁর কাছে যাবে। অন্য কোনো থার্ড পার্টির কাছে যাবে না। অতত্রব, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দাবি—পাসপোর্ট বাংলাদেশ হাইকমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে, এটা রহস্যজনক ও সন্দেহজনক। ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী তারেক রহমানের পাসপোর্টটা বাংলাদেশ হাইকমিশনে যাওয়ার কথা নয়।’
রাজনৈতিক আশ্রয়ের বিষয়টি গোপন রাখতে চেয়েছিল বিএনপি : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, অন্য দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মূল দেশের নাগরিকত্ব ছাড়তে হয়। তিনি বলেন, ‘আমার ক্লেইমের (দাবির) মূল বিষয় নাগরিকত্ব ছিল না, ছিল পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া। কিন্তু বিএনপির নেতার কথায়ই এখন প্রমাণ হচ্ছে যে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন। তাই নাগরিকত্বের কথাটি আমি এখন আরো জোরালোভাবে দাবি করব।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অ্যাসাইলাম সিকাররা (আশ্রয়প্রার্থীরা) রাষ্ট্রবিহীন বা স্টেটলেস থাকেন, তাঁরা যে  দেশের লোক সে দেশে বাঞ্ছিত নন বা সে দেশে যেতে চান না, এ কারণে তাঁরা পাসপোর্ট সমর্পণ বা হ্যান্ডওভার করেন। তারেক রহমান ঠিক তাই করেছেন।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদেশে তারেক রহমানের কাছে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রমাণের একমাত্র দলিল ছিল তাঁর বাংলাদেশি পাসপোর্ট। সেটিই তিনি ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তরে ফেরত দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ‘ব্যাপারটা বিএনপি গোপন করতে চাইছিল। কারণ তারা সত্য স্বীকার করতে চায় না।’
‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা, পাসপোর্ট না থাকা আর নাগরিকত্ব না থাকা—এগুলো এক বিষয় কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিবিসিকে বলেন, ‘না, আমি সেটা দাবি করব না। এখানে আইনি ব্যাখ্যার সুযোগ আছে।’ পাল্টা প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘তাহলে তারেক রহমানের আইডেনটিটি (নাগরিকত্ব পরিচয়) কী? আমার নতুন প্রশ্নটি হলো, তিনি চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশি পাসপোর্ট, ভিসা নিয়ে যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। সেই পাসপোর্ট ভিসা আর তিনি ব্যবহার করছেন না।’ তিনি আরো বলেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে গেলেই তিনি যে দেশ থেকে গিয়েছেন সেই দেশের সব কিছু সারেন্ডার করতে হয়। সেই দেশের নাগরিক হিসেবে আপনি তা আর ক্লেইম করতে পারেন না। তারেক রহমান ঠিক তাই করেছেন।’
তারেক রহমানের পাসপোর্ট লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে হস্তান্তর বিষয়ে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের চিঠি প্রকাশ করা কতটা যৌক্তিক জানতে চাইলে শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘১০০ ভাগ  যৌক্তিক। কারণ বিএনপিই চ্যালেঞ্জ করেছিল যেন আমি এটা প্রকাশ করি। এ চিঠি গোপনীয় কিছু নয়।’

No comments

Powered by Blogger.