পার্পল ড্রিম'- ফুল কুমারীর গল্প

পার্পল ড্রিম' টিমের যাত্রার শুরু থেকে আমরা ছিলাম আটজন। ঢাকা থেকে মানালি পর্যন্ত এই আট জনের যাত্রা ছিল। মানালি গিয়ে আরও একজন আমাদের সাথে যোগ দেয়। মোট হল নয়। তো পুরো ট্রিপে এই নয়জনের নানা রকম রসালো গল্প জমেছিল। যার মধ্যে সব গল্প হয়তো বলা বা লেখা যাবেনা, বা লিখলেও খুব সাবধানে লিখতে হবে কারণ বন্ধুত্ব নষ্ট হবার সম্ভাবনা আছে!  তবে আজকে আপাতত “বিনা চিনি কা চায়ে ও ফুলকুমারীর” গল্পটা বলি। কারণ এই গল্পটা লেখার অনুমোদন পাওয়া গেছে। আমাদের নয়জনের মধ্যে ইংরেজি সবাই কম-বেশী বা কাজ চালানোর মত করে পারে। ইংরেজিতে আমাদের তেমন একটা সমস্যা নেই। কিন্তু হিন্দিতে সামান্য ঘাটতি ছিল দুই একজনের। তার উপর পুরো ভারতে হিন্দি চললেও, একেক জায়গার হিন্দির উচ্চারণ, অর্থ আর ভাষাগত ব্যাপার একেক রকম। যেটা এক জায়গার মানুষ আরেক জায়গার মানুষেরটা ঠিকঠাক বুঝতে পারেনা।  ঠিক যেমন আমাদের একই বাংলা ভাষার অঞ্চল ভেদে তার নানা রকম অর্থ আর উচ্চারণ। ঢাকায় এক তো, বরিশালে আরেক। উত্তর বঙ্গে এক রকম তো, দক্ষিণে আরেক রকম বা সিলেট, চাটগাঁ আর নোয়াখালী যদি ধরেন, এক জনের উচ্চারণ আর অর্থ আরেকজন বুঝতে পারেনা বা বোঝা খুব মুশকিল হয়।  তো আমাদের এই ঘটনাটা ঘটেছিল একেক জায়গায় চা খেতে গিয়ে। কারণ চা মানেই কমন কিছু ব্যাপার। গরম পানি, চা পাতা বা টি ব্যাগ, দুধ, চিনির মিশ্রণ ব্যাস। এসবে কোন সমস্যা ছিলনা বা হতনা। কিন্তু হল, আর সেটা হল আমাদের টিমের সবচেয়ে বিনোদনদায়ী বড় ভাইয়ের সামান্য একটু সমস্যা ছিল খাওয়া-দাওয়া নিয়ে। যাবার আগেই তিনি বারবার করে বলে গেছেন যে তাকে খাবার-দাবার খুব নিয়ম মেনে খেতে হবে। দুই বেলা রুটি আর এক বেলা ভাত খেতে হবে, শক্ত খাবার খাওয়া যাবেনা এবং অবশ্যই চায়ে কোন রকম চিনি খাওয়া যাবেনা। ব্যাস এইগুলোই। কিন্তু খাবার সময় দেখা গেল তিনি ঠিক ঠিক দুই বেলাই রুটি খান তবে সেটা আটটা রুটির কম না! আর সাথে অন্যান্য তরকারি মোটামুটি দুই প্লেট তো লাগেই! পাশাপাশি বিরিয়ানি পেলে ভাইয়ের আর কিছু মনে থাকেনা! অন্যান্য খাবার তো আছেই। মোট কথা প্রথম দিন শুধু কলকাতায় ছাড়া তিনি আর কোথাও তার নিজের দেয়া কথাই রাখতে পেরেছেন বলে আমার মনে পড়েনা! তো যেটা বলছিলাম চা খেতে গিয়েই বাঁধল প্রথম বিড়ম্বনা। চিনি ছাড়া চা খাবেন এটা দোকানিকে বোঝাতে তিনি একেক সময় একেক রকম হিন্দি আর সাথে ইংরেজি এমনকি মাঝে মাঝে হিন্দি আর ইংরেজির সাথে বাংলাও মিশিয়ে দারুণ একটা খিচুড়ি ভাষার উৎপন্ন করেছিলেন! কখনো

“চা দিন, উইদআউট সুগার!”

 “অনলি চা, সুগার নেহি!”

“ভাইয়া বিনা সুগার কা চায়ে মিলেগা?”

“টি সুগার ছাড়া!”

“নো চিনি, অনলি টি!”

নানান জায়গায় এমন নানান রকম ভাষা ব্যবহার করতে লাগলেন। আমরা শুনি আর হেসে গড়িয়ে পড়ি। কিন্তু মানালি থেকে লেহ যাবার পথে এক জায়গায় তিনি দোকানিকে কোন ভাবেই চিনি ছাড়া চায়ের কথা বোঝাতে পারছিলেন না। আমরা কয়েকজন সেটা মজা নিয়ে উপভোগ করছিলাম, তার হিন্দি, ইংরেজি আর বাংলার মিশ্রণের সাথে হাত ও মুখ দিয়ে নানা ভাবে বোঝানোর চেষ্টা যে চিনি ছাড়া চা খেতে চাইছেন!

অবশেষে দোকানিই তাকে উদ্ধার করেছিলেন, নিজ থেকে যেটুকু বুঝেছেন সেটা দিয়েই। দোকানি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন

“বিনা চিনি কা চায়ে?”

দোকানির এই জিজ্ঞাসায় তিনি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন, এমন একটা খুশীর হাসি দিলেন যে সেটা দেখে আমরা সবাই সমস্বরে চিৎকার করে উঠেছিলাম ইয়েস “বিনা চিনি কা চায়ে!” আমাদের সমন্বিত চিৎকার শুনে তিনি কিছুটা লজ্জিত হলেও, বিনা চিনি কা চায়ের জন্য দারুণ আনন্দিতও হয়ে ছিলেন।

তো এর পর থেকে পুরো ট্রিপের সব জায়গায় চায়ের প্রসঙ্গ এলেই আমরা দোকানিকে নিজ থেকেই জানিয়ে দিতাম এক কাপ বিনা চিনি কা চায়ে! সেই সাথে পুরো ভ্রমণে তার নামই হয়ে গিয়েছিল বিনা চিনি কা চায়ে! তাকে কোন দরকার হলেই আমরা 'বিনা চিনি কা চায়ে' বললেই তিনি ফুলকুমারীর মত লজ্জিত হয়েই আমাদের ডাকে সাড়া দিতেন।

ও হ্যাঁ ফুলকুমারীর গল্পটা তো বলা হলনা! ভাইজানের ফুল ভীষণ পছন্দের। তা সে কার পছন্দ না ফুল? তবে ভাইজানের একটু বেশীই পছন্দ ছিল, তাই যেখানেই তিনি একটু ফুলের দেখা পেতেন, সেখানেই তিনি ফুল কুমারী সেজে যেতেন! দাঁড়িয়ে যেতেন ফুলের সাথে, ফুলকুমারী হাসি দিয়ে! আর আমাদের কে ডেকে বলতেন...

খিঁচো, ফটো খিঁচো!

আমরাও আমাদের 'বিনা চিনি কা চায়ে' কে, ফটো খিঁচে দিতাম আনন্দ নিয়েই, ফুলকুমারী বলে কথা!

এই হল আমাদের, 'পার্পল ড্রিম' টিমের, বিনা চিনি কা চায়ে ও ফুলকুমারীর গল্প...! 

Comments