Header Ads

ইসলাম যেভাবে হিন্দুস্তানে আসে


[হিন্দুস্তান বা হিন্দুস্থান, বর্তমান Indian Subcontinent (ভারতীয় উপমহাদেশ) এর ঐতিহাসিকভাবে জনপ্রিয় নামগুলির একটি। এই নামের আক্ষরিক অর্থ “সিন্ধু নদের দেশ”। হিন্দুস্তান নামটি বেশ প্রাচীন, যা এসেছে আদি ফার্সি শব্দ “হিন্দু” থেকে। ফার্সি ভাষায় সিন্ধু নদকে বলা হতো হিন্দু নদ। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনপ্রিয় “স্তান” অনুসর্গটি (ফার্সি ভাষায় যার অর্থ “স্থান”)। আগে হিন্দুস্তান বলতে গোটা উপমহাদেশকেই বোঝাত।
ঐতিহাসিকভাবে “হিন্দু” কোন ধর্মের নাম নয় বরং সিন্ধু নদের পাড়ে বসবাসরত মানুষদেরকে বোঝাতো তারা যে ধর্মের অনুসারীই হোক না কেন। অন্যদিকে, বর্তমান হিন্দুধর্মের মূল নাম হচ্ছে সনাতন ধর্ম (সংস্কৃতঃ सनातन धर्म) যা কালের বিবর্তনে এখন হিন্দুধর্ম নামে পরিচিত হয়ে গিয়েছে।
সারা বিশ্বের মুসলিমগণ অতীতে এই অঞ্চলকে (এবং এখনও) “আল-হিন্দ/হিন্দুস্তান” বলেই ডাকতেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, রাসূল ﷺ এর সময়ও এই উপমহাদেশকে বুঝানোর জন্য আল-হিন্দ (الهند) নামটি ব্যবহৃত হয়েছে। এই ওয়েবসাইট এর মূল ইংরেজি আর্টিকেলগুলোতে India বলতে বুঝানো হয়েছে গোটা উপমহাদেশ, যা মূলত হিন্দুস্তান। ঐতিহাসিকভাবে ইসলামের হারানো ইতিহাস এর ক্ষেত্রেও তাই আমরা “হিন্দুস্তান” নামটিই ব্যবহার করব আজ হিন্দুস্তানে (বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানে) বসবাসরত প্রায় ৫০ কোটি মুসলিম এই অঞ্চলকে বিশ্বের মুসলিম জনশক্তির অন্যতম একটি কেন্দ্রে পরিণত করেছে। ইসলাম সর্বপ্রথম এই অঞ্চলে আসার পর থেকেই এই অঞ্চলের মানুষদের মাঝে অনেক অবদান রেখেছে এবং এখনও রেখে যাচ্ছে। কিভাবে এই বিশাল অঞ্চলে ইসলাম এসেছে তা নিয়ে অনেক মতবাদ আছে। রাজনৈতিভাবে, কেউ কেউ (যেমন বর্তমান ভারতের ‘হিন্দুত্ব’ আন্দোলন) ইসলামকে বিদেশী বলে আখ্যা দেয়ার চেষ্টা করে, তাদের ভাষ্যমতে, আরব ও পারস্যের মুসলিমদের বহিরাক্রমণের কারণেই এখানে ইসলামের প্রবেশ ঘটে ও বিস্তার লাভ করে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা এরকম নয়।

হিন্দুস্তানের সর্বপ্রথম মুসলিমগণ
রাসূল ﷺ এর জন্মের পূর্বে থেকেই আরব ব্যবসায়ীদের হিন্দুস্তানে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে তারা পশ্চিম হিন্দুস্তানের উপকূলীয় বন্দরগুলোতে ভীড়তেন। ব্যবসার মূল দ্রব্য ছিল মশলা, স্বর্ণ এবং আফ্রিকান পণ্য। স্বাভাবিকভাবেই আরবরা যখন নতুন নতুন ইসলাম গ্রহণ করে, তারা তাদের এই নতুন ধর্ম হিন্দুস্তানের উপকূলে নিয়ে আসে। এভাবে হিন্দুস্তানের প্রথম মুসলিম “পেরুমল ভাস্কর রবি বার্মা” ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে (রাসূল ﷺ এর জীবনকালেই) কেরালা তে হিন্দুস্তানের প্রথম মসজিদঃ চেরামান জুম’আ মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। আরব মুসলিম এবং হিন্দুস্তানীদের মাঝে অব্যাহত বাণিজ্যের মাধ্যমে ইসলাম আস্তে আস্তে হিন্দুস্তানের উপকূলীয় শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এর মূল মাধ্যমগুলো ছিল দেশান্তর এবং ধর্মান্তরীকরণ। মুহাম্মাদ বিন কাশিম
হিন্দুস্তানে ইসলাম সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়ে দামেস্ক-ভিত্তিক উমাইয়া খলিফাদের শাসনামলে। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে, সিন্ধু অঞ্চলে উমাইয়াদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে উমাইয়ারা মাত্র ১৭ বছর বয়সী তায়েফের এক অধিবাসীঃ “মুহাম্মাদ বিন কাশিম” কে নিয়োগ দেয়। ‘সিন্ধু’ হচ্ছে উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, যা বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধু নদের তীরবর্তী এলাকা। মুহাম্মাদ বিন কাশিম এর নেতৃত্বাধীন ৬০০০ সৈন্যের এক বাহিনী পারস্যের সবচেয়ে-পূর্বের ‘মাক্‌রান’ (বর্তমান সিন্ধু এবং বেলুচিস্তানের দক্ষিণে) অঞ্চলে এসে পৌঁছায়।

হিন্দুস্তানে আসার পথে তিনি তেমন বাধার সম্মুখীন হননি। সিন্ধু নদের তীরবর্তী শহর ‘নেরুন’ এর কাছাকাছি পৌঁছালে শহরের বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা তাকে স্বাগত জানান, শহরটি মূলত সন্ন্যাসীদের অধীনেই ছিল। সিন্ধু নদের তীরবর্তী অন্যান্য শহরগুলোও এরপর কোন যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়াই স্বেচ্ছায় মুসলিমদের অধীনে চলে আসে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে, নির্যাতিত বৌদ্ধ সংখ্যালঘুরা তাদের এলাকার হিন্দু শাসক থেকে পালিয়ে মুসলিম সেনাবাহিনীর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে।

জনসাধারণের মধ্যে সিংহভাগের মুসলিমদের প্রতি সমর্থন থাকা সত্ত্বেও, সিন্ধুর রাজা দাহির মুসলিমদের এই অগ্রযাত্রার বিরোধিতা করেন এবং মুহাম্মাদ বিন কাশিম এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। ৭১২ খ্রিস্টাব্দে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ শেষ হয় রাজা দাহিরের শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে। এই বিজয়ে পুরো সিন্ধু মুসলিমদের অধীনে চলে আসে।

উল্লেখ্য যে, সিন্ধুর জনসাধারণকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয়নি। বরং প্রকৃতপক্ষে, কারো দৈনন্দিন জীবনে কোন পরিবর্তনই আসেনি। মুহাম্মাদ বিন কাশিম তার অধীনস্থ হিন্দু ও বৌদ্ধদের নিরাপত্তা দেন এবং ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দেন। উদাহরণস্বরূপ, আগের মতোই ব্রাহ্মণরা কর সংগ্রহের দায়িত্বে আর বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা তাদের মঠ রক্ষণাবেক্ষণ এর দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে। ধর্ম পালনের এই স্বাধীনতা এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার কারণে, অনেক শহরের অধিবাসীরা গান-বাজনার মাধ্যমে মুহাম্মাদ বিন কাশিম এবং তার বাহিনীকে অভিবাদন জানায়।

ধর্মান্তরীকরণের নমুনা
ধারাবাহিক জয়ের মাধ্যমে মুসলিম সেনারা একই পদ্ধতিতে হিন্দুস্তান র অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে থাকে। হিন্দুস্তানের সমাজের ধর্মীয় এবং সামাজিক কাঠামো পরিবর্তন করা ছাড়াই গজনীর সুলতান মাহমুদ এবং মুহাম্মাদ তুঘলুক মুসলিমদের রাজনৈতিক এলাকা বিস্তৃত করেন।

প্রাক-ইসলামিক যুগে হিন্দুস্তানের সমাজের কাঠামোর ভিত্তি ছিল বর্ণ প্রথা, যার মাধ্যমে সমাজ কয়েক অংশে বিভক্ত ছিল। মানুষের মাঝে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ব্যাপারটা ধাপে ধাপে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক বর্ণের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে। এর পিছনে বিভিন্ন কারণও ছিল। বর্ণ প্রথার বৈষম্যের চেয়ে ইসলাম সমাজে যে সমতা এনেছিল তা মানুষের কাছে বেশী আকর্ষণীয় ছিল। বর্ণ প্রথায় মানুষের অবস্থান নির্ণয় হয় জন্মের মাধ্যমে। সমাজে সক্রিয় অবদান রাখা তো দূরের কথা, এমনকি পিতা-মাতার যতটুকু অর্জন করেছে তার চেয়ে বেশী অর্জন করাই সম্ভব ছিল না। ইসলাম এসে মানুষকে উপরে ওঠার সুযোগ করে দেয়, ব্রাহ্মণ গোত্রের পরাধীনতা থেকে দেয় মুক্তি। উপমহাদেশের এককালের জনপ্রিয় ধর্ম ছিল বৌদ্ধধর্ম। মুসলিম শাসনামলে এসে ধর্মটি আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যেতে থাকে। উপমহাদেশের মানুষ সাধারণত বর্ণ প্রথা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার লক্ষ্যে কোন বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে গিয়ে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করতো। যখন ইসলাম তাদের কাছে আরো ভাল এক বিকল্প হিসেবে আসে, তারা বৌদ্ধধর্মের পরিবর্তে ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু বর্ণ প্রথা ত্যাগের ব্যাপারটা যথারীতি চলছিল। মুসলিমদের আগ্রাসনে উপমহাদেশে বৌদ্ধধর্ম ধ্বংস হয়ে গিয়েছে বলে যে জনশ্রুতি আছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যে। মুসলিম শাসনামলে বৌদ্ধদের ধর্ম পালনে কোন রকম বাধা দেয়া হয়নি এবং জোর করে ধর্মান্তরীকরণ কিংবা আগ্রাসনের কোন প্রমাণও নেই।

হিন্দুস্তানে জনসাধারণের মাঝে ইসলাম এর বাণী পৌঁছিয়ে দিতে শিক্ষকগণ মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। মুসলিম পণ্ডিতগণ গোটা হিন্দুস্তান জুড়ে পরিভ্রমণ করেছিলেন, মানুষকে ইসলামের শিক্ষা দেয়াকে করে নিয়েছিলেন জীবনের লক্ষ্য। বেশীরভাগই আবার সুফী মতবাদ প্রচার করেছিলেন। এই মতবাদ ছিল ইসলাম প্রচারের এক রহস্যময় পন্থা যা জনসাধারণকে অনেক কৌতূহলী করে তুলেছিল। শুধুমাত্র মুসলিম শাসকদের নিকটস্থ সমাজের অভিজাত শ্রেণীদেরই নয়, গ্রামাঞ্চলের বৃহৎ জনসংখ্যাকে ইসলামের পথে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এই শিক্ষকদের সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল।

ইসলাম এর প্রসার কি জোর-জবরদস্তি করে হয়েছে?
দাবী করা হয় যে, হিন্দুস্তানে ইসলামের অসংখ্য অনুসারীর কারণ হচ্ছে জোর-জবরদস্তি এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ধর্মান্তরীকরণ। এ ব্যাপারে কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেনি। যদিও পরবর্তীতে মুসলিম শাসকদের পরিবর্তে হিন্দু রাজারা শাসনে এসেছিল, কিন্তু সমাজ রয়ে গিয়েছিল আগের মতোই। জবরদস্তি ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ধর্মান্তরীকরণ এর ঘটনা খুবই কম, তাছাড়া একাডেমিক আলোচনা এবং গবেষণার ক্ষেত্রেও বিশ্বাসযোগ্য নয়।

ইসলাম যদি সত্যিই সত্যিই সংঘাত ও যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করতো, তাহলে হিন্দুস্তানে মুসলিম সম্প্রদায় আজ শুধুমাত্র অন্যান্য মুসলিম অঞ্চলের কাছাকাছি জায়গাগুলোতে বিদ্যমান থাকতো। অর্থাৎ শুধুমাত্র উপমহাদেশের পশ্চিমাংশে মুসলিম জনসংখ্যা থাকতো। বরং আমরা এখন যা দেখতে পাই তা হলো উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলাম ছোট-বড় আকারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের ১৫ কোটি মুসলিম রয়েছে উপমহাদেশের সর্ব-পূর্বে, যা হিন্দুস্তানের বিশাল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের মাধ্যমে অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন। এমন আরো বিচ্ছিন্ন অঞ্চল আছে পশ্চিম-মিয়ানমার, মধ্য-হিন্দুস্তান এবং শ্রীলঙ্কার পূর্বাঞ্চলে। এই অঞ্চলগুলোতে মুসলিমদের অস্তিত্বই প্রমাণ করে ইসলাম শান্তিপূর্ণভাবে গোটা উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে, মুসলিম শাসক ছিল কি ছিলনা তার উপর নির্ভর করে নয়। অনেকের দাবী ইসলাম জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে বিস্তার লাভ করেছে, একথা সত্যি হলে উল্লেখিত অঞ্চলগুলোতে মুসলিম সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব থাকতো না।

ইসলাম হচ্ছে এই উপমহাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই উপমহাদেশ এখন এক বহুজাতিক ও বহু ধর্মের মানুষের অঞ্চল। এখানে ইসলামের অবস্থান কেমন তা উপলব্ধি করা খুবই জরুরী। ইসলামকে অনেকে এমনভাবে অ্যাখ্যা দেন যেন এটি যুদ্ধ-বিগ্রহের ধর্ম, আবার অনেকে বলেন এটি একটি বিদেশী ধর্ম। এ ধরনের দাবীকে ইসলামের শান্তিপূর্ণ বাণী প্রচারের মাধ্যমেই মোকাবেলা করতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.