ডিম–কুসুমের টেম্পারা

ছবির কথা বললেই আসে রঙের কথা। হতে পারে তেলরং, জলরং, প্যাস্টেলসহ নানা কিছু। তবে ডিমের কথা কোনোভাবেই মনে আসে না। ছবি আঁকতে কিন্তু ডিমও ব্যবহার করা হয়। সেই আদ্দিকালে, যখন তেল-জলের রং ব্যবহার শুরুই হয়নি, তখন থেকেই ডিমের কুসুমের রং দিয়ে ছবি আঁকা হতো।

বিজ্ঞানের উন্নতিতে ছবি আঁকার নতুন সব মাধ্যম এসেছে। অনেক শিল্পী রংতুলি ফেলে ক্যামেরা-কম্পিউটারে সখ্য গড়েছেন, নাম দিয়েছেন ডিজিটাল পেইন্টিং! তবে সেই প্রাচীনকালের ডিমের ব্যবহার এখনো লুপ্ত হয়নি। এ মাধ্যমের নাম টেম্পারা।

কীভাবে তৈরি হয় টেম্পারা? শিল্পী শহিদ কবীর জানান কায়দাটি—অতি সন্তর্পণে ডিমের কুসুমের পর্দা ছিঁড়ে সংগ্রহ করতে হবে কুসুম। এর সঙ্গে মেশাতে হবে তিসির তেল ও বরিকের গুঁড়া। এ তিন উপাদানের সঙ্গে সমপরিমাণ পানি মিলিয়ে তৈরি করতে হয় মিশ্রণ। অক্সাইডের সঙ্গে মিলিয়ে-মিশিয়ে এ মাধ্যমটি দিয়ে ছবি আঁকলে সেটি স্থায়ী হয় শত শত বছর। আর এ ছবি যত পুরোনো হবে, ততই আভা ছড়াবে, শোভা বাড়াবে।

তরুণ শিল্পীদের সঙ্গে টেম্পারার পরিচয় করানো দরকার ছিল। সম্প্রতি সেই আয়োজন করেছে কিবরিয়া ছাপচিত্র স্টুডিও। শিল্পী শহিদ কবীরের পরিচালনায় কলাকেন্দ্রে তারা আয়োজন করেছে ১২ দিনের কর্মশালা ‘এগ টেম্পারা’। গত শতকের সত্তরের দশক থেকে এই মাধ্যমটি নিয়ে কাজ করছেন শহিদ কবীর। কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন তরুণ ১৫ জন শিল্পী। কাছ থেকে তরুণেরা দেখতে-শিখতে পারলেন প্রাচীন এই মাধ্যমটি ব্যবহারের কৌশল। শহিদ কবীর বলেন, ‘তেলরঙের বহু আগে এ মাধ্যমটি দিয়ে ছবি আঁকা হতো।’ আঙুলের ইশারায় টেম্পারায় নিজের আঁকা একটি ছবি দেখিয়ে বললেন, ‘এটা আশির দশকে আঁকা। এ রকম কত কত দশক-শতক পেরিয়ে যায়, টেম্পারার ছবি মলিন হয় না। তবে ক্যানভাস বা কাগজ নয়, একটু শক্ত কিছুর ওপর আঁকতে হয়। বোর্ড, কাঠ হলে ভালো। খরচ একদম কম।’

শিক্ষকের কর্মশালায় এসেছেন চারুকলার পুরোনো বেশ কজন শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাসের নানা ঘটনার স্মৃতিচারণার পাশাপাশি চলছিল খুনসুটি। স্টুডিও ঘুরতে ঘুরতে দেখা যায়, এক শিল্পীর হাতে চুল শুকানোর যন্ত্র। আঁকা শেষ করে যন্ত্রটি ব্যবহার করে ছবির রং শুকাচ্ছিলেন তিনি। লালন দর্শনে প্রভাবিত শহিদ কবীর বললেন, ‘ছবি আঁকতে খুব বেশি অর্থ ব্যয় হয় না। ডাল-ভাত খেয়ে বাঁচতেও সামান্য টাকা লাগে। তবে টাকা রোজগারের উদ্দেশে ছবি আঁকলে সেটা অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়!’

কর্মশালায় আঁকা ছবিগুলো কাল মঙ্গলবার সাজানো হবে কলাকেন্দ্রের দেয়ালে। মোহাম্মদপুর ইকবাল রোডের ১/১১ নম্বর বাড়ির চতুর্থ তলায় সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দেখে আসা যাবে সেগুলো। শহিদ কবীরের প্রত্যাশা, কর্মশালা করা পাঁচজন শিল্পীও যদি মাধ্যমটিতে চর্চা চালিয়ে যান, সেটাই হবে তাঁর সার্থকতা।

Comments