Header Ads

সূর্যোদয়ের রাজ্য থেকে

সন্ধ্যা হবে হবে। এমন সময়টাতে আমরা যখন টোকিও পৌঁছলাম, শহরের রূপ তখন কেবলই খুলতে শুরু করেছে। চারদিকে রঙিন আলোর ঝিকিমিকি, ঝাঁ–চকচকে বিশাল দালানের সারি আর নেপথ্য কোলাহলের আবহ মিলিয়ে যেন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির পাতা থেকে উঠে আসা বিচিত্র এক শহর টোকিও। চোখধাঁধানো এই শহরে একই ছাদের নিচে একত্র হলাম আমরা সার্কভুক্ত দেশগুলোর ১০৫ জন শিক্ষার্থী। সঙ্গে ছিলেন ৭ জন শিক্ষক।

২৬ নভেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জেনেসিস (জাপান ইস্ট এশিয়া নেটওয়ার্ক অব এক্সচেঞ্জ ফর স্টুডেন্টস অ্যান্ড ইয়ুথ) প্রোগ্রামে মূলত জাপানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এখানে অংশগ্রহণের আগে বাছাই প্রক্রিয়ার প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছিল নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। পরের ধাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, নটর ডেম কলেজ, হলিক্রস কলেজ, মাস্টারমাইন্ড স্কুল ও সানিডেইল স্কুল থেকে আমাদের ১৬ জনকে নির্বাচিত করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পুরো প্রোগ্রামে বাংলাদেশি দলের সুপারভাইজার হিসেবে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ। এ ছাড়া দলের সমন্বয়কারী ছিলেন জাইসের (জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো–অপারেশন সেন্টার) কর্মী সাতোসান ও কিকুচিসান।

ভূমিকম্পনপ্রবণ দেশটির দুর্যোগের ভয়াবহতা বোঝাতে প্রথমেই আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় টোকিও ফায়ার ডিপার্টমেন্ট লাইফ সেফটি লার্নিং সেন্টারে। কৃত্রিমভাবে তৈরি ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে আমাদের দলের সদস্য লামিয়ার (আইবিএ) সেকি চিৎকার! এই ভূমিকম্প অবশ্য দলের আরেক সদস্য হালিম ভাইকে (ঢাবি) দমিয়ে দিতে পারল না। বিকেলে ইম্পেরিয়াল প্যালেসের অসাধারণ স্থাপত্যশৈলী দেখে তিনি ঘোষণা দিয়ে ফেললেন, জাপানি স্থাপত্য নিয়েই তিনি পড়বেন। সেদিন হোটেলে ফিরে আমরা একেকটা দলে ভাগ হয়ে গেলাম। আনিকা, ফাসবির, ফুয়াদ আর সামি—হাইস্কুল পড়ুয়ারা একদিকে। অন্যদিকে আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, আমাদের দল তৈরি হলো মালদ্বীপের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে।

পরদিন আমরা ঘুরে দেখলাম টেপিয়া (অ্যাসোসিয়েশন ফর টেকনোলজিক্যাল এক্সিলেন্স প্রমোটিং ইনোভেটিভ অ্যাডভান্সেস)। এখানে জাপানের সবচেয়ে উন্নত, অদ্ভুত প্রযুক্তিগুলোর প্রদর্শনী দেখে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ! হতবুদ্ধিতার রেশ কাটতে না–কাটতেই হোটেলে ফিরে মেইজি ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক নাকামুরা আকিরার বক্তব্য শুনতে বসে পড়লাম। মিথ্যে বলব না, দীর্ঘদিনের বাঙালি অভ্যাস ভুলে জাপানি আদবকেতা ও সময়নিষ্ঠা আত্মস্থ করতে করতে আমাদের অবস্থা ততক্ষণে ত্রাহি মধুসূদন!

অতঃপর হাইস্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিচ্ছেদের পালা। ওদের হিরোশিমা পাঠিয়ে দিয়ে আমরা বুলেট ট্রেনে করে যাত্রা করলাম আওমোরির উদ্দেশে। ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ২৭০ কিমি, সে এক এলাহি কাণ্ড! সাদ্দাম ভাইয়ের (আইবিএ) গান আর তওসীফের (ঢাবি) বকবক শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। উঠেই ছবির মতো সাজানো নানবুটাউন দেখে রীতিমতো ধাক্কা খেলাম। এত উন্নত গ্রামের দেখা পেলাম এই প্রথম!

প্রথমেই টাউনের মেয়র সুকেনাও কুদো ফোন করে আমাদের স্বাগত জানান। পরদিন ইয়াহু জাপান করপোরেশন পরিদর্শন করে, জাপানে সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে ইয়াহুর একচ্ছত্র আধিপত্যের কথা শুনে অবাক হলাম। হাচিনোহে গাকুইন ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে সেখানকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচয় হলো। নানান ভাষার মিশ্রণ ও সংকেতের আশ্রয়ে আলাপ সারতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। তবে একটু পর যখন আর্চারি, ক্যালিগ্রাফি ও অরিগ্যামি করতে গিয়ে আমাদের বন্ধুত্ব জমে গেল, তখন আমাদের কিচিরমিচির থামাতে গিয়ে সমন্বয়কারীরাই বরং ঝামেলা পড়ে গেলেন! তারপর বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘শপিং’ পর্ব। এই পর্বে অবশ্য সামিন (নটর ডেম কলেজ) আর নাফিস (ঢাবি) ভাই-ই নেতৃত্ব দিলেন।

অনুষ্ঠানের ষষ্ঠ দিনে জাপানের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। ইয়াতা-উমা নামের কাঠের ঘোড়ার গায়ে নকশা করে আর শুকনো ফুলের হস্তশিল্পে নৈপুণ্য দেখিয়ে সবাইকে অবাক করে দেয় আলভি (ব্র্যাক)। তারপর আমাদের একেকটা দলে ভাগ করে পাঠানো হয় স্থানীয় কয়েকটি পরিবারের কাছে, যেন তাঁদের সঙ্গে থেকে আমরা জাপানের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারি। ফারহাতকে (ইউআইইউ) খাওয়ার কষ্ট থেকে উদ্ধার করতে, চন্দ্রা আপুর (ইউআইইউ) রন্ধনশৈলীর ওপর ভরসা করে খিচুড়ি আর মুরগির মাংস রেঁধেছিলাম আমরা। স্বাদ ছিল অমৃতসম, এই অভিজ্ঞতাও অসাধারণ। জাপানি ভাষায় হাসিবের (এনএসইউ) রাখা বক্তব্য আর শাড়ি-পাঞ্জাবি পরে আমাদের দেশীয় সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে শেষ হয় আওমোরি পর্ব।

টোকিওতে ফিরে জেনেসিস থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা নিয়ে সব কটি দলকে প্রেজেন্টেশন দিতে হলো। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলো জাপান ভ্রমণ। ফেরার আগে সারক হিসেবে আমরা আমাদের ভিনদেশি বন্ধুদের হাতে তুলে দিলাম বাংলাদেশের ২ টাকার কাগুজে নোট আর হাতে বানানো বিভিন্ন পাটের জিনিস। জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রাবাব পারভীন আমাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। সব শেষে ৫ ডিসেম্বর আমরা দেশে ফিরে আসি।

জাপানিরা কীভাবে তাঁদের মানবসম্পদকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে, সেটাই ছিল এই স্বল্প দিনের ভ্রমণে সবচেয়ে বড় শিক্ষা। হয়তো বাংলাদেশও একদিন এই কৌশল রপ্ত করতে পারবে। নিজেদের সামর্থ্যের শতভাগ দিয়ে আমরাও আমাদের কাজের জন্য বিশ্বের কাছে সমাদৃত হতে পারি।

No comments

Powered by Blogger.