গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

সবুজরঙা ক্যাম্পাসটার সামনে হয়তো খালি মাঠ নেই, কিন্তু ওপরের প্রশস্ত ছাদ সেই দুঃখ খানিকটা ঘুচিয়ে দেয়। ছাদের চারদিকে রয়েছে নানা রকম গাছ। গড়ে উঠেছে ছোট্ট একটা বাগান। বাগানের মাঝখানের খালি জায়গায় রাখা চেয়ার-টেবিলে বসে কেউ পড়ছেন, কেউ ক্যারম বা টেবিল টেনিস খেলছেন। কেউবা পাশের ক্যানটিন থেকে এনে খাচ্ছেন শিঙাড়া–সমুচা। জমে উঠছে আড্ডা। গত বুধবার রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সবুজ ভবনটায় পা রেখে এমন দৃশ্য চোখে পড়ল। পূর্বাচল আমেরিকান সিটিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ চলছে। সেখানে স্থানান্তরিত হলে নিশ্চয়ই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির নামকরণ আরও সার্থকতা পাবে। ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রিন ইউনিভার্সিটির আটটি বিভাগে প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন ১৮৩ জন শিক্ষক। রয়েছে ছাত্রছাত্রীদের গড়ে তোলা ১৭টি সংগঠন। ডিবেট ক্লাব, স্পোর্টস ক্লাব, গ্রিন ব্লাড ক্লাব, কালচারাল ক্লাব, ইকো ওয়ারিঅর ক্লাব ছাড়াও প্রতিটি বিভাগেরই নিজস্ব কিছু সংগঠন আছে।সবুজের প্রত্যয় ক্যাম্পাসের আনাচকানাচ ঘুরে দেখতে দেখতে একসময় গিয়ে দাঁড়ালাম মিলনায়তনের সামনে। সেখানে একদল শিক্ষার্থী একটি অনুষ্ঠানের মহড়ায় ব্যস্ত ছিলেন। এক ফাঁকে তাঁদের সঙ্গে আলাপ করার সুযোগ হলো। স্বপ্রণোদিত হয়েই তাঁরা নিজেদের ক্যাম্পাস সম্পর্কে নানা তথ্য দিলেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি এখানে সহশিক্ষা কার্যক্রমকেও বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিছুদিন আগে চলচ্চিত্র নায়িকা পূর্ণিমার তত্ত্বাবধানে চালু হয় অভিনয় শেখার একটি কোর্স। পূর্ণিমার ছাত্রী, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সুরাইয়া আক্তার বলেন, ‘যাঁর অভিনয় টিভিতে দেখে ভালো লাগত, এখন তাঁর কাছ থেকেই অভিনয় শিখছি। উচ্চারণ শিখছি। বাচনভঙ্গি শিখছি। এটা আমার জন্য একটা দারুণ ব্যাপার।’

গ্রিন ইউনিভার্সিটিতে প্রতিটি বিভাগের শিক্ষার সঙ্গেই পরিবেশবিষয়ক পড়ালেখাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সব বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের পড়তে হয় পরিবেশ নিয়ে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকো ওয়ারিঅর ক্লাবের সদস্যরা পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেন। কিছুদিন আগে যেমন তাঁরা দল বেঁধে সাইকেল চালিয়ে শেওড়াপাড়া ক্যাম্পাস থেকে পূর্বাচলে স্থায়ী ক্যাম্পাসে গেছেন। যাওয়ার পথে রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করেছেন। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই একটা জায়গায় গাছ লাগিয়েছেন তাঁরা। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের ইতিহাস–ঐতিহ্যের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয় গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সংগঠনগুলো। গত একুশে ফেব্রুয়ারি একুশজন ভাষাসৈনিককে বিশ্ববিদ্যালয়টি সম্মাননা দিয়েছে। বিজয় দিবসেও কালচারাল ক্লাবের উদ্যোগে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী শাহীন সামাদ। শিক্ষার্থীদের তিনি শুনিয়েছেন তাঁর অভিজ্ঞতার গল্প। স্পোর্টস ক্লাবের উদ্যোগে এখানে বিভিন্ন আন্তবিশ্ববিদ্যালয় টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়। এ বছরে গ্রিন ইউনিভার্সিটি এবং দেশের সাবেক ফুটবলারদের সংগঠন সোনালি অতীত মিলে আয়োজন করেছিল ফারাজ চ্যালেঞ্জ কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। সেখানে ২৪টি দলের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয় স্বাগতিক গ্রিন ইউনিভার্সিটির দল। স্পোর্টস ক্লাবের প্রেসিডেন্ট কাজী গোলাম মুস্তফা বলেন, ‘ফারাজ গোল্ড কাপ নামে আমরা নিয়মিত এই টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে চাই। আশা করছি আগামী বছর প্রায় ৩২টি বিশ্ববিদ্যালয় খেলায় অংশ নেবে।’ অন্যদিকে গ্রিন ব্লাড ক্লাবও পিছিয়ে নেই। এই বছর এই ক্লাব থেকে এখন পর্যন্ত ৬৫০ ব্যাগ রক্ত দান করা হয়েছে। তথ্যটা দিলেন ক্লাবেরই সদস্য তানভীর আদনান। পড়ালেখার চাপের মধ্যে এত সব কীভাবে সামলে নেন? জানতে চাইলে সাবর আগে জবাব দিলেন টেক্সটাইল বিভাগের তানজিম খান। বললেন, ‘পড়ার চাপ সব সময় থাকে। ছুটির দিনগুলো ছাড়া বারো মাস সমান চাপ থাকে বলে আলাদা করে আমরা পড়ার চাপটা টের পাই না। তা ছাড়া নিয়মিত ক্লাস করলে, নিয়মিত পড়লে পড়ালেখাটা সহজ হয়ে যায়।’ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো, ক্যাম্পাসে তাঁদের সময়টা দারুণ কাটে। ক্লাসের ফাঁকে তাঁরা চায়ের দোকানে আড্ডা দেন, আর পাশাপাশি চলে সংগঠনের কাজ। নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন সিনিয়রদের সঙ্গে। যাঁরা অনেকেই এখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভালো অবস্থানে আছেন। আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে পূর্বাচলের নিজস্ব ক্যাম্পাসে ক্লাস চালু হওয়ার কথা। ছাত্রছাত্রীরা কেমন ক্যাম্পাস চান, এ বিষয়ে নিয়মিত তাঁদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। ভীষণ রোমাঞ্চ নিয়ে শিক্ষার্থীরাও একটা নতুন শুরুর অপেক্ষায় আছেন। শিক্ষার্থীদের একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা আমাদের লক্ষ্য। সে জন্য আমরা তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিই। প্রথমত, ছেলেমেয়েরা যেন একাডেমিক জ্ঞানের দিক থেকে যেকোনো ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার যোগ্য হয়ে উঠতে পারে। দ্বিতীয়ত, তারা যেন সঠিক মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হয়। এবং তৃতীয়ত, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তারা যেন দেশের জন্য অবদান রাখে। জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই প্রভাব ফেলছে। তাই শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সচেতন করে তুলতেও আমরা সচেষ্ট। আমাদের এখানে মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা আছে। সম্প্রতি ইউ এস বাংলা গ্রুপের সঙ্গে আমাদের একটা চুক্তি হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী গ্রিন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ইউ এস বাংলা গ্রুপের ১০টি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পাবে। এটা আমাদের জন্য একটা বড় পাওয়া।

Comments