পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করে

আমার বয়স ১৯ বছর। আমি খোলামেলা মনে সবার সঙ্গে মিশতে পছন্দ করি। আড্ডাপ্রিয় মানুষ আমি, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে। পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঘুরতে যেতেও ভালো লাগে। কিন্তু এই সুযোগ আমার জীবনে আসেনি। কারণ, আমার পরিবারের মানুষেরা পুরোনো ধ্যানধারণায় বিশ্বাসী। আমি পড়াশোনায় ভালো। তারপরও বইয়ের মধ্যে সব সময় মুখ গুঁজে থাকতে হয় বাধ্য হয়ে। ৯-১০ মাস থেকে এসব আমি আর সহ্য করতে পারি না। মনে হয় আমার কাছের মানুষগুলো আমাকে সহ্য করতে পারছে না। তারা শুধু সামনাসামনি আমাকে ভালো রাখার আর ভালোবাসার অভিনয় করছে। আমার আম্মু-আব্বু বকাঝকা করলে এখন মেনে নিতে পারি না। বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করে। মনে হয় আমাকে কেউ বোঝে না, বোঝার চেষ্টা করে না। তখন রাতদিন এসব বিষয়ই সব সময় মাথার মধ্যে ঘোরে। মাঝেমধ্যে ভীষণ কান্নাও করি। আমি স্বাভাবিক জীবন চাই।

নাম ও ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক

পরামর্শ

তোমার এখন যে বয়স, এই সময়ে বন্ধুবান্ধবের সাহচর্য খুব ভালো লাগারই কথা। উপরন্তু তোমার ব্যক্তিত্বে বহির্মুখিতা রয়েছে, অর্থাৎ তুমি সামাজিকতা বেশ পছন্দ করো বলে আরও বেশি যন্ত্রণা বোধ করছ এ ধরনের বাধ্যবাধকতার মধ্যে থাকতে গিয়ে। হয়তোবা তোমাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্যদের চাহিদা অনুযায়ী আচরণ করতে হয়েছে, আর তাই মনটা এখন বিদ্রোহী হয়ে পড়েছে।

আমরা যখন দীর্ঘদিন চাপা ক্ষোভগুলো নিজের ভেতরে চেপে রাখি, তখন রাগটা অনেক সময় ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। তোমার ক্ষেত্রে এখন যা হচ্ছে, তা হলো কাছের মানুষগুলোকে তোমার বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে, ওরা তোমাকে পছন্দ করে না। সেই সঙ্গে তোমার অবচেতন মনও কিন্তু বলছে যে, তুমিও তাদের ভালোবাসতে পারছ না।

সামাজিক শিক্ষায় যেহেতু এটি বলা হয় যে পরিবারের কাছের মানুষগুলোকে ভালোবাসতে এবং শ্রদ্ধা করতে হবে, এর ফলে অবচেতন মনে তাদের প্রতি রাগ প্রচণ্ড অস্বস্তি তৈরি করে আমাদের মধ্যে। এই অস্বস্তি পরে অপরাধবোধে রূপান্তরিত হয়। আমরা হয়তো সচেতনভাবে বড়দের সঙ্গে ভালোভাবে আচরণ করছি ঠিকই, কিন্তু মানসিক শান্তিটুকু নিশ্চিত করতে পারছি না। অভিভাবকেরা যে তোমার মঙ্গলের জন্যই অনেক কিছু চাপিয়ে দিচ্ছেন, তাতে সন্দেহ নেই। তবে তাঁরা যে পদ্ধতিতে তোমার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার প্রায়ই চালাচ্ছেন, তাতে হিতে বিপরীত হচ্ছে। তাঁরা যদি একই সঙ্গে তোমার ঘুরতে যাওয়ার ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সময় কাটানোর ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে পারতেন, তাহলে তুমি এতটা বিক্ষুব্ধ হতে না। তাঁদের সঙ্গে তোমার একটি পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে উঠলে জোর করে পড়ার টেবিলে বসে থাকার বিষয়টিও তৈরি হতো না। দুঃখজনক হচ্ছে, বর্তমানে বেশির ভাগ অভিভাবক শুধু সন্তানের লেখাপড়ার ওপরই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এতে করে তারা যে জীবনকে ভালোবেসে এবং মনের কোমল অনুভূতিগুলো স্ফুরণ ঘটিয়ে বড় হবে, তার পথটি রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

তোমাকে অনুরোধ করব, বাবা অথবা মাকে কোনো দোষারোপ না করে তুমি সুন্দর করে গুছিয়ে একটি চিঠি লেখো। তাঁদের কাছে তোমার যে চাওয়াগুলো রয়েছে এবং তুমি যে কতটা কষ্টে থাকো, সেগুলো চিঠিতে উল্লেখ করো, কেমন? আশা করি তাঁরা তোমার দৃষ্টিকোণটি কিছুটা হলেও বুঝতে সক্ষম হবেন।

Comments