শিক্ষা উদ্যোক্তার সন্ধানে

তৃতীয় লিঙ্গের কাউকে দেখলে খুব ভয় পেতাম। মনে হতো এরা আমাদের থেকে ভিন্ন। একদিন তাঁদের একটি দল আমাদের বাসায় এসেছিল। সেদিন তাঁদের আচরণ আমাকে আরও ভীত করে। কিন্তু একইভাবে আরেকটি চিন্তাও মাথায় ঘুরপাক খায়—তাঁরা কি আমাদের মতো স্বাভাবিক জীবন পেয়েছেন? শিক্ষার সুযোগ নেই, কাজ নেই। মনে হয়েছে, তাঁদের এই অবস্থার জন্য আমিও দায়ী। সেদিন থেকে তাঁদের শিক্ষা ও স্বনির্ভরতা নিয়ে কাজ করার ভাবনা শুরু।’ বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রুবাইয়া শারমিন। এই ভাবনা উপস্থাপন করে এ বছর শিক্ষা-উদ্যোক্তা আইডিয়া কোয়েস্ট-২০১৭-তে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে রুবাইয়া ও তাঁর দল।

গত নভেম্বরে আইইআরের এডুকেশন এন্ট্রাপ্রেনিউর সোসাইটি (ইইএস) এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের সহযোগী ছিল প্রথম আলো। শিক্ষাবিষয়ক ভাবনা উপস্থাপনের এই প্রতিযোগিতায় ১৩১টি প্রকল্প জমা পড়ে। তিন পর্বের এই প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় পর্বে সুযোগ পেয়েছিল ৫১টি দল। সব শেষে অন্য ভাবনাগুলোকে পেছনে ফেলে ১২টি দল ফাইনালে উঠে আসে। গত ২৮ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত হয় চূড়ান্ত পর্ব। সেখানে রুবাইয়া শারমিনের নেতৃত্বে চ্যাম্পিয়ন হয় তাঁর দল বৃহন্নলা। মাসরুর নাভিদের নেতৃত্বে প্রথম রানার্সআপ হয়েছে ‘সায়েন্স স্কোয়াড’ ও আসরাফুল হকের নেতৃত্বে দ্বিতীয় রানার্সআপের স্থান পেয়েছে ‘ফায়ারবোল্ট’। নিজেদের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিকভাবে চ্যাম্পিয়ন দল পাচ্ছে এক লাখ টাকা। প্রথম রানার্সআপ ও দ্বিতীয় রানার্সআপ পেয়েছে যথাক্রমে ৭০ হাজার ও ৪০ হাজার টাকা।

বৃহন্নলা দলটির মূল ভাবনা হলো, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। সমাজের এই গোষ্ঠীকে একটা স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থায় নিয়ে আসার চেষ্টা করা হবে ‘এডুকেশন অ্যান্ড প্রপার রাইট ফর ম্যাক্স’ প্রকল্পের মাধ্যমে, যার আওতায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য থাকবে একটি কমিউনিটি মডেল লার্নিং সেন্টার। সেখানে তাঁদের জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, উপানুষ্ঠানিক সাক্ষরতা শিক্ষা, কাউন্সেলিং ও আইটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁরা যদি ব্যবসা করতে চান, সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক সহায়তাও দেওয়া হবে। প্রকল্পটি সাজিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআরের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রুবাইয়া শারমিন ও একই বিভাগের সাদিকুল ইসলাম।

সায়েন্স স্কোয়াড দলটি জরিপ করে দেখেছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। তাদের জরিপ বলছে, অধিকাংশ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী বিষয়গুলো না বুঝে মুখস্থ করে, এটাই এই অনাগ্রহের কারণ। এই দলের মূল উদ্দেশ্য হলো বিজ্ঞানের বিষয়গুলো আরও সহজবোধ্য করে শিক্ষার্থীদের সামনে সরাসরি হাজির করা। তাদের হাতে-কলমে শেখানো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চার শিক্ষার্থী মাসরুর নাভিদ, মোনতাসির আরাফাত, নাজিম উদ্দিন ও সাইফুল ইসলাম ছিলেন এই ভাবনার নেপথ্যে।

প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় রানার্সআপ হওয়া ‘ফায়ারবোল্ট’ কাজ করবে শিক্ষা-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো নিয়ে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পড়ালেখা, বিদেশে পড়তে যাওয়া, বিষয় পছন্দ, ক্যারিয়ার বাছাইসহ নানা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হবে তাদের প্রকল্পের মাধ্যমে। এই দলে আছেন কাজী আশরাফুল হক ও সামিয়া মেহেদী খান। তাঁদের বক্তব্য, তথ্যের অভাব যেন প্রতিভা বিকাশের বাধা হতে না পারে।

আরও সংবাদ
বিষয়:


Comments