Header Ads

ছোট লক্ষ্যে বড় বিজয়

গত বছর এ রকম সময়েই সদ্যপ্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের একটা বক্তৃতা শুনছিলাম। তিনি একদল তরুণ-তরুণীকে অনুপ্রাণিত করার জন্য নিজের পেশাদারি জীবন নিয়ে বলছিলেন। শুনতে শুনতে অবাক হলাম। একজন মানুষ যাঁর জীবনে এত অর্জন, তিনি বক্তৃতার সিংহভাগ সময় নিজের জীবনের বিভিন্ন ব্যর্থতা নিয়ে কথা বললেন। বিশেষ করে তাঁর কর্মজীবনের শুরুর দিকের কথা। কীভাবে বিভিন্ন ধরনের ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছিলেন এবং কীভাবে সেটা কাটিয়ে উঠেছিলেন।

আনিসুল হকের কথা শুনে আমার যে বিশ্বাসটি আরও দৃঢ় হলো, সেটা হচ্ছে মানুষ কখনোই এক ধাপে অনেক বড় কোথাও পৌঁছাতে পারে না। একটু একটু করে ছোট ছোট পায়ে সব বড় পথ অতিক্রম করতে হয়।

এটা শুধু তাঁর ক্ষেত্রেই সত্য নয়। আমি আমার জীবনে যত সফল মানুষ দেখেছি, তাঁদের সবার বড় অর্জনের পেছনে আছে অনেক অনেক ছোট ছোট চেষ্টা ও অর্জন। সেই ছোট অর্জনগুলোর কোনোটাই হয়তো তাঁদের বড় অর্জনের সঙ্গে তুলনা করলে তেমন চিত্তাকর্ষক মনে হবে না। কিন্তু শেষ গন্তব্যে যাওয়ার জন্য প্রতিটাই অপরিহার্য।

এ বিষয়ে বলতে গেলে স্বভাবতই ক্রিকেটের কথা চলে আসে। সম্প্রতি তামিম ইকবাল এবং এর আগেও বহু সফল ক্রিকেটার বলেছেন যে সেঞ্চুরি করব এটা ভেবে শুরু থেকেই খেললে সাফল্যের সম্ভাবনা কম। সময় বুঝে পরিস্থিতি বুঝে প্রতিটা ব্লক, প্রতিটা লিভ, প্রতিটা সিঙ্গেলকে গুরুত্ব দিতে হবে। ছোট ছোট জিনিসগুলো ঠিক করে করতে পারলে আস্তে আস্তে ১০০ রানের চূড়া প্রথমে দৃশ্যমান এবং পরে অতিক্রম হবে।

পাহাড়ে চড়ার বিষয়টাও একই। বেশ কিছু পর্বতারোহীর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। এ বিষয় নিয়ে আমার কৌতূহলও বেশি। তাই পর্বতারোহীদের লেখা বেশ কিছু বই আমি পড়েছি। সবাই বলেছেন যে বিশেষ করে লাস্ট বেজ ক্যাম্প থেকে চূড়া পর্যন্ত যাওয়ার পথে গন্তব্যের শেষের কথা ভাবলে চলবে না। তখন মন ও শরীরে ভয় ঢুকে যাবে। তিন হাজার ফুট কি, দশ পাও এগোনো যাবে না। ভাবতে হবে পাঁচ পা, দশ পা করে।

আমার নিজের জগৎ, অর্থাৎ নাট্যজগতে আসি। অনেক বছর আগে বরিশাল থেকে একটি বেঁটে কৃষ্ণবর্ণের ছেলে ঢাকায় এল অভিনয় করার স্বপ্ন দেখে। সব বড় অভিনেতা যেভাবে নিজেকে তৈরি করে, অর্থাৎ মঞ্চের অনুশীলনের মাধ্যমে, সেই ছেলে সেটাই করল। মঞ্চ নাটকে কোনো ধরনের পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। তাই পেট চালানোর জন্য নানা ধরনের চেষ্টা চালিয়ে গেল মঞ্চের কাজের পাশাপাশি। টুকিটাকি লেখার কাজ, টিউশনি করা। অনেক বছর কাটল নানা ধরনের আর্থিক-সামাজিক কষ্টে। পরিবার থাকে বরিশালে। তাদেরও যত্ন নিতে হয়। মঞ্চ এমন এক জায়গা, যেখানে এসেই বড় চরিত্রে কাজ করার সুযোগ মেলে না। ছোট ছোট চরিত্র এমনকি প্রডাকশন সহকারী হিসেবেও কাজ করতে হয়। যত ঝামেলাই থাকুক না কেন, মহড়া মিস করার সুযোগ নেই। ভোরের লঞ্চে করে বরিশালে গিয়ে পারিবারিক ঝামেলার সমাধান করে দুপুরের লঞ্চে ঢাকায় ফিরে মহড়া ধরতে হয়। ছেলেটি চালিয়ে গেল। একসময় তার প্রতিভা বড়দের চোখে পড়ল। অতঃপর সে টেলিভিশনে সুযোগ পেল। ২৫ বছরের বেশি কষ্ট করার পর সেই ছেলে আজকে বাংলাদেশের সবচাইতে জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিম। আমি নিশ্চিত যে বেঁটেখাটো নায়কের চেহারাবিহীন ছেলেটা যদি শুরুর থেকেই দেশের সবচেয়ে বড় অভিনেতা হওয়া নিয়ে উন্মত্ত থাকত, তাহলে সে অনেক আগেই হাল ছেড়ে দিত।

যেকোনো বড় যাত্রার শুরুতেই গন্তব্য অনেক কঠিন মনে হয়। আমরা গন্তব্যের ওপর বেশি মনোনিবেশ করি বলেই হয়তো সেখানে পৌঁছানোর কঠিনটা দেখে ভয়ে হাল ছেড়ে দিই। মনে রাখতে হবে যে প্রতিটা বড় যাত্রাই হয় অনেক অনেক ছোট পা ফেলায়। লক্ষ্য মাথায় রেখে ছোট পা ফেলায় মনোযোগ দিলেই যাত্রা সফল হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ছোট ছোট সহজ কাজগুলো ঠিক করে করলেই বড় কিছু অর্জন করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

আরেকটা কথা। বড় কিছু এখনই অর্জন করছি না, তাই বলে ছোট কাজগুলো ভালো না লাগার কোনো কারণ নেই। আনিসুল হক, তামিম ইকবাল, মোশাররফ করিম—যাঁর কথাই বলি না কেন, সবার কাছে জীবনের ছোট কাজগুলো ছিল আনন্দের। প্রতিটি মহড়া, প্রতিটি রান, এভারেস্টের দিকে প্রতিটি পা ফেলা। যাঁরা করেছেন তাঁদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায় যে বড় অর্জনের পাশাপাশি এই ছোট কাজগুলো তাঁদের জীবনে অবিস্মরণীয় ও মধুর। এই অভিজ্ঞতা আমাদের জন্যও মধুর হওয়া উচিত। বড় আয়োজনে উদ্‌যাপন করা না হলেও নিজের কাছে ভালোবেসে, কাছের মানুষের সঙ্গে শেয়ার করে। প্রতিটি ছোট কাজ আমরা একটু হলে বুকে বেঁধে রাখি।

স্বপ্ন দেখি বড় কিছুর। আনন্দের সঙ্গে বিন্দু বিন্দু জল সংগ্রহ করে তৈরি করি সেই অতল সাগর। সবার প্রতি আর নিজের প্রতি এই আমার কামনা। আর যাঁরা পথ দেখিয়েছেন এবং দেখাচ্ছেন, তাঁদের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

No comments

Powered by Blogger.