বাবা ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতন করতেন ইয়েলেনাকে!

মাত্র ১৬ বছর বয়সে টেনিসে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন ইয়েলেনা ডকিচ, ২০০০ সালে উইম্বলডনের সেমিফাইনালে ওঠেন তিনি। তবে এর পেছনে চরম মূল্য দিতে হয় তাকে।

য়ুগোস্লাভিয়ায় জন্ম নেয়াএই অস্ট্রেলিয়ান টেনিস খেলোয়াড় একসময় বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে চার নম্বরে ছিলেন এবং ২০০০ সালের উইম্বলডনে সেমিফাইনালে জায়গা পান।

খুব কম বয়স থেকেই ইয়েলেনার বাবা দামির ডকিচ তার কোচের দায়িত্ব পালন করেন। টেনিস খেলোয়াড় ইয়েলেনা জানান, বছরের পর বছর তার বাবা তার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালান। ইয়েলেনার অভিযোগ, দামির নিয়মিত তাকে চামড়ার বেল্ট দিয়ে মারতো এবং লাথি মারতো। কখনো কখনো শরীরের কোনো অংশ থেঁতলে যেত এবং রক্তপাত হতো। এক সময় তিনি আত্মহত্যার কথাও ভেবেছেন।

৩৪ বছর বয়সী ইয়েলেনা একটি বই বের করেছেন।  বিবিসি ওয়ার্ল্ড  এর স্পোর্টসআওয়ার অনুষ্ঠানে তিনি তার বাবার বিরুদ্ধে গালি দেয়া, হোটেল থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি উইম্বলডনের সময় খেলোয়াড়দের কক্ষে লুকিয়ে থাকতাম’

ডকিচের বাবার সাথে ৬ বছর বয়স পর্যন্ত সম্পর্ক স্বাভাবিক ছিল।

এরপরই শুরু হয় মৌখিক ও শারীরিক নির্যাতন। এতোকিছুর পরেও তিনি পেশাদার টেনিসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৯৯ সালে উইম্বলডনে তৎকালীন এক নম্বর তারকা মার্টিনা হিঙ্গিসকে হারান। ২০০০ সালের উইম্বলডনের সেমিফাইনালে লিন্ডসে ড্যাভেনপোর্টের কাছে হেরে যান ২০০০ সালের উইম্বলডনে দামির ডকিচকে কোর্ট থেকে বের করে নেয়া হচ্ছে

‘আমি হারলেও এটা ছিল দারুণ কিছু, কিন্তু বাবা আমাকে হোটেলে উঠতে বারণ করেন। বিকাল পর্যন্ত আমি খেলোয়াড়দের কক্ষে ছিলাম, সন্ধ্যায় সেখানেই ঘুমানোর চেষ্টা করি। একটি ঘুমানোর জায়গায় লুকিয়ে ভেবেছিলাম সেখানে আমাকে কেউ দেখতে পারবে না। আমার কাছে কোনো টাকা ছিল না। গণমাধ্যমও এটাকে হাস্যকর ভেবেছে’

২০০০ সালে ডকিচের বাবাকে সব ধরণের নারী প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। ইউএস ওপেন চলাকালীন তিনি খেলোয়াড়দের কক্ষে স্যামন মাছ নিয়ে ঝামেলা করেন। সে বছরই উইম্বলডনে তিনি সেন্ট জর্জের পতাকা জড়িয়ে কোর্টে ঢোকেন। এরপর দর্শকদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করেন এবং এক সাংবাদিকের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলেন।

‘মানুষ দেখেছে আমার বাবা কেমন ছিল, তার ব্যবহার কেমন ছিল।  উইম্বলডন, ইউএস ওপেন, অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে কী করেছেন তা সবাই দেখেছে। আমি ভাবতাম, কেউ আমাকে এসে জিজ্ঞেস করবে যে আমি কেমন বোধ করছি, কিন্তু কেউ করেনি। আমি তখনো গণমাধ্যমকে বুঝতে পারিনি।  সবাই এটাকে হাস্যকর ও কৌতুক হিসেবেই দেখেছিল! উইম্বলডনে আমার বাবাকে নিয়ে শিরোনাম হলো। কিন্তু মনে হলো, সবই যেন কৌতুক। ‘

তখন ডকিচ তার দেশ পরিবর্তন করেয়ুগোস্লাভিয়া যান বর্তমানে যেটি সার্বিয়া। এতে সমালোচনা সইতে হয় তাকে। তার ভাষায়, ‘এটা মোটেও আমার সিদ্ধান্ত ছিল না,আমি অস্ট্রেলিয়া ভালোবাসি। আমি দেশটার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি ১১ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ায় উদ্বাস্তু হিসেবে এসেছিলাম। আমার ১৭ বছর বয়সে বাবা আমাকে নিয়ে যান। সে আমাকে অনুভব করাতো, যেন আমি কিছুই পারিনা। ‘বইয়ে ডকিচ লিখেছেন, এক রাতে একটি স্যুটকেস নিয়ে তিনি বের হয়ে যান। তখন তার যাবতীয় উপার্জিত অর্থ বাবার নামে লিখে দেন। ইয়েলেনা তার ছোট ভাইয়ের সাথে অনেকদিন কথাও বলতে পারেননি।

‘এটা ক্ষমতার কিছু ছিলনা. আমার মনে হচ্ছিল আমি অনেক মানুষকে বঞ্চিত করছিলাম। আমার ভাই তাদেরই একজন। প্রায় ছয় বছর আমি ভাইয়ের সাথে কথা বলতে পারিনি, এটা অনেক কঠিন ছিল আমার জন্য। আমি অনুতপ্ত বোধ করতাম,আমার মনে হতো আমি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছিলাম। এমনকি আমি ঘর ছাড়ার পরেও আমার জীবন অতিষ্ট করে তুলতে চেয়েছেন তিনি। আমি আমার বাবার সাথে কথা বলি না’

২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ান রাষ্ট্রদূতকে হাতবোমা দিয়ে ভয় দেখানোর দায়ে দামির ডকিচকে গ্রেফতার করা হয়। সেবছরই ইয়েলেনা ডকিচ টেনিস কোর্টে ফেরেন। ২০০৫ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মাত্র একবার গ্র্যান্ডস্লাম খেলেন ইয়েলেনা। তার র‍্যাঙ্কিং নেমে যায় ৬২১ এ। অবশেষে ২০১৪ সালে তিনি অবসর নেন।

‘আমি তার সাথে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু যে তার কৃতকর্ম নিয়ে অনুতপ্ত নন তার সাথে যোগাযোগ করা কঠিন। আমি ৩০ বছর ধরে এমন সহ্য করে এসেছি। আমার আশা করতাম আমারএকটা বাবা থাকতো যে কঠিন সময়ে পাশে থাকতো। কিন্তু দুর্ভাগ্য মানুষ তার বাবা বাছাই করতে পারে না।

Comments